Friday, June 17, 2016

সব চরিত্র কাল্পনিক



১.
তিনুচাঁদ ডিরোজিওকে মারিয়াছে- তাই ডিরোজিও হেডডাইনি মহাশয়ার কাছে নালিশ করিয়াছে।
হেডডাইনি রকিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে বলিলেন, "কি হে তিনুচাঁদ, তুমি ডিরোজিওকে মেরেছ?"
তিনুচাঁদ বলিল, "আজ্ঞে না, মারব কেন? পোস্টার ছিঁড়ে দিয়েছিলাম, চড়থাপ্পড় মেরেছিলাম, আর একটুখানি চুল ধরে ঝাঁকিয়ে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলাম। আর মেয়েদের, হেঁহেঁ..."
হেডডাইনি বলিলেন, "কেন অমন করেছিলে?"
তিনুচাঁদ খানিকটা আমতা আমতা করিয়া পশ্চাদ্দেশ চুলকাইয়া বলিল, "আজ্ঞে, ওরা যে খালি খালি গুরুমাকে অপমান কচ্ছিল।"
হেডডাইনি জিজ্ঞাসা করিলেন, "আমাদের গুরুমাকে?"
"হ্যাঁ।"
"পোস্টার দেখিয়েছে?"
"হ্যাঁ"
"গান গেয়েছে?"
"হ্যাঁ"
"সিয়া রাম। স্লোগান দিয়েছে?"
"হ্যাঁ।"
"আর?"
"বার বার ঘ্যান ঘ্যান করে দশই এপ্রিল দশই এপ্রিল বলছিল, তাই আমার রাগ হয়ে গেল।"
ডাইনিমহাশয়া তাহার গাল ধরিয়া বেশ ভালোরকম নাড়াচাড়া দিয়া বলিলেন, "সোনা দালাল। লক্ষ্ণী দালাল। এমাসে তোমার ভাতার টাকা বাড়িয়ে দেবো।"

ডিরোজিও বলিল, "মেয়েদের মলেস্ট করা হয়েছে..."
হেডডাইনি দাঁত বাহির করিয়া বলিলেন, "মলেস্ট বললেই তো আর মলেস্ট হয় না। আগে দেখতে হবে ভগ্নাংশ না ত্রৈরাশিক। তারপর জানতে হবে ওদের মলেস্ট না আমাদের মলেস্ট। তারপর বলতে হবে কে করেছে, আর কি কি করেছে।"

ডিরোজিও বলিল, "আমরা আপনার পদত্যাগ দাবি করছি।"
হেডডাইনি গদিমোড়া চেয়ারে দুলিতে দুলিতে বলিলেন, "তোমরা পঁচিশ জন কি বলছো তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রী আমাকে চায় (পেছনে মৃদুভাবে 'হাওয়ামে উড়তা যায়ে মেরা লাল দুপাট্টা মলমলকা' বাজিয়া উঠিল), আমি কোত্থাও যাবো না।"

পিছনে দাঁড়াইয়া বড়ো মেজো সেজো দালালরা বলিল, কেয়াবাৎ কেয়াবাৎ।

২.

মিডিয়া তিনুচাঁদকে জিজ্ঞাসা করিল, "হ্যাঁ হে তিনুচাঁদ, তুমি খামখা ডিরোজিওকে মারলে কেন?"
তিনুচাঁদ গুটখার পিক ফেলিয়া বলিল, "খামকা মারব কেন? কেন মেরেছি মাওমাকুর বাচ্চাদেরই জিজ্ঞেস করুন না।"
ডিরোজিওকে জিজ্ঞাসা করিতে সে বলিল, "খামকা নয়তো কি? তুই দুশো কোটির মুজরোয় গড়বা নাচছিস, নাচ, আমায় বাপু তবলা বাজাতে বলিস কেন? আর যদি বললি, বাজাবো না বলে প্রতিবাদ করলে তাই নিয়ে আবার মারামারি করতে এলি কেন?"
মিডিয়া হলুদ কালির কলম খুলিয়া বসিল। আর সকলে বলিল, "আহা কি হয়েছে খুলেই বলো না।"


ডিরোজিও বলিলঃ

তিনুচাঁদ মুজরোর ব্যাকগ্রাউণ্ডে ঝোলাবার জন্য একটা ছবি এঁকেছে, ছবির নাম সেন্টার ফর এক্সেলেন্স। সেটা দেখিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করল, কেমন হয়েছে?
আমি বললাম, বললাম, এটা কি এঁকেছ? লোকজন ছেনি হাতুড়ি নিয়ে বসে কলেজবাড়িটাকে ভাঙছে ক্যানো? আর প্রফেসররা এমন দুয়োরানির মত পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে কি কারণে?
তিনুচাঁদ বলল, -না না, ভাঙছে কোথায়? ও তো রেনোভেশন হচ্ছে, ডুপ্লে। আর প্রফেসররা পালিয়ে যাচ্ছে না তো, বেশি টাকার চাকরি পেয়ে সেই লোভে চলে যাচ্ছে। সে যাকগে, কেউ অপরিহার্য নয়।
আমি বললাম, ছেলেগুলোকে অমন গলায় কাঁটামারা বকলস পরিয়ে রেখেছো কেন? আর অথরিটি লাঠি হাতে ডিগবাজি খাচ্ছে কেন?
তিনু বলল, আহা তা কেন, ওটা তো বকলস নয়, পঁচাত্তর পার্সেন্ট। মানে রেগুলেশন আরকি। আর ওটা বুঝি লাঠি হল, ও তো ডিসিপ্লিন। সেন্টার ফর এক্সেলেন্সে এইটুকু থাকবে না? আদর দিয়ে দিয়ে ব্যাটার বাঁদর হয়ে যাচ্ছিল।
আমি বললাম, তাই বুঝি? কিন্তু ওখানে পুলিশ প্ল্যাকার্ড-পোস্টার ছিঁড়ে ছেলেমেয়েদের মারধোর করছে কেন? আর এদিকে একটা ছেলে শিক্ষামন্ত্রীকে জুতো দেখাচ্ছে সেটাই বা কি ব্যাপার?
তিনু বলল, কোথায় আবার মারধর দেখলে? এখানে অভব্য ছাত্রছাত্রীদের একটা চক্রান্ত হচ্ছিল পুলিশ সেটাকেই রুখে দিয়েছে মাত্র। আর ওটাকে বুঝি জুতো দেখানো বলছ? ও তো আমাদের তিনোছিপি.. থুড়ি, থুড়ি, না না... ম্যাও পুষি, গুণ্ডা ছাত্রছাত্রীরা মেরে ওর জামা-জুতো ছিঁড়ে দিয়েছে তাই শিক্ষামন্ত্রীকে মনের দুঃখে সেসব দেখাতে গিয়েছিল।
আমি বললাম, তা হবে। আমি ওসব বুঝিটুঝি না। আচ্ছা ওই হাওয়াই চপ্পল পরা মেয়েমানুষটি যে ওদের তেড়ে মারতে আসছে ওটি কে? আর পেছনে আর একজন পেটমোটা মহিলা হাতে চেক ধরে ওনাকে বার বার সেজদা করছে তিনিই বা কে?
তিনুচাঁদ বলল, তুমি তো আচ্ছা মুখ্যু হে। উনিই তো আমাদের হেডডাইনি। সেজদা আবার কি কথা, টাকা পেয়ে উনি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন মাত্র। আর হাওয়াই চপ্পল কাকে বলছ! ওই তো স্বয়ং নিওকমিউনিজম, বুঝতে পারছ না?
বলে বার বার উদ্দেশ্যে নমস্কার করতে লাগল।


৩.

ডিরোজিও বলিলঃ

তখন আমি বললাম, "আচ্ছা এক কাজ কর না কেন ভাই, ওটাকে সেন্টার ফর এক্সেলেন্স না করে কসাইখানা বানাও না কেন? নিউকমিউনিজমকে চটির বদলে একটা ছোট গোঁফ দিয়ে ফ্যাসিবাদ বানিয়ে দাও। ছেনি হাতুড়িগুলো পাল্টে মাংস কাটার ছুরি করে দাও। কলেজবাড়িটার নাম মুছে ঘাসফুল চিকেন শপ নাম দাও। আর ছেলেমেয়েগুলোকে পালক টালক দিয়ে মুরগি বানিয়ে দাও, গলায় কাঁটামারা বকলস বেশ মানিয়ে যাবে। লাঠি হাতে অথরিটিটাকে করে দাও কসাই, ওদের তাড়িয়ে খোঁয়াড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ আর সাদা পোশাকে ওই কাদের দেখছি ওরা হচ্ছে খদ্দের, শুক্কুরবার এসেছে উইকেণ্ডের ছুটির জন্য মাংস কিনতে। তিনোছিপি না ম্যাওপুষি কি বললে সেখানে তো দেখছি মোটে দুজন আছে, ওদের মাথায় মাথায় জুড়ে দাঁড়িপাল্লা করে দাও। নিরপেক্ষ ওজন পাওয়া যাবে। ম্যাওপুষির জুতোটাকে হাঁড়ি করে দাও আর টাকার চেকটাকে খুন্তি, হেডডাইনি ফ্যাসিবাদের পায়ের তলায় ঝুঁকে বসে মাংসের কালিয়া রান্না করছেন।" তিনুচাঁদ ক্ষেপে গিয়ে বলল, "এক থাপ্পড় মারব হারামজাদা, জানিস না উনি নিরামিষ খান?"

আমি বললাম, "তাহলে ভাই আর এক কাজ করো। ওটাকে বেঙ্গল লিডস করে দাও। তাহলে নিওকমিউনিজমকে আর বদলাতে হবে না, উনি ইনভেস্টমেন্ট আনতে যাচ্ছেন। প্রফেসরগুলোকে করে দাও শিল্পপতি। ছেলেমেয়েগুলোকে কোটপ্যান্ট পরিয়ে পিএ আর ডেটা অ্যানালিস্ট করে দেওয়া যাবে। আর কলেজটা হবে অডিটোরিয়াম, তার দরজায় হেডডাইনিকে বসিয়ে দিও, শিল্পপতি কমিউনিটির আবেগের স্বার্থে। আর ঐ যে বকলস আর লাঠি, ওগুলো একটু বদলিয়ে দিলেই জিডিপি গ্রোথের চার্ট আর ডায়াগ্রাম হয়ে যাবে। ম্যাওপুষিরা হবে তাজা ছেলে, উন্নয়ন হলে এদের সিণ্ডিকেট করে দুপয়সা আসবে। প্ল্যাকার্ড পোস্টারগুলো আদিবাসীদের, শালারা ডেভলপমেন্টের বিরোধিতা করতে এসেছে। আর পুলিশ তো আছেই, উপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে, বাস।"

কথাটা তিনুচাঁদের পছন্দ হল না। তাই আমি অনেক ভেবেচিন্তে আবার বললাম, "তাহলে বাংলা-রাজস্থান মৈত্রী উদযাপন করো না কেন? ওই কলেজবাড়িটা হবে উত্তর কলকাতার পুরোনো চকমিলানো বাড়ি, এখন ভেঙে মাড়বারবাসীদের হাউজিং কমপ্লেক্স হয়েছে। পুলিশদের করে দাও এ রাজ্যের মেহমান, তাদের খাতিরদারি করা হচ্ছে। প্রফেসররা বাঙালি মধ্যবিত্ত, তারা উন্নয়ন আর উদারতার স্বার্থে কলকাতা ছেড়ে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। পঁচাত্তর পার্সেন্টটা হল কলকাতার ভাগাভাগি, কতটা কাদের থাকবে তাই নিয়ে। প্ল্যাকার্ড পোস্টারগুলো কমিউনাল বাঙালি প্রাদেশিকদের, ওসব ছিঁড়ে দেওয়াই ভালো। হেডডাইনিকে করে দাও মাড়বারের রাজকন্যা মধুশ্রী আর নিউকমিউনিজম হবে রানা চণ্ড, বেশ একটা রোম্যান্টিক হিস্টরিক্যাল অ্যাঙ্গল হবে।" চেক আর ম্যাওপুষিটাকে কি রকম করতে হবে সেইটা বলতে যাচ্ছি, এমন সময় তিনুচাঁদ আমায় ধাক্কা দিয়ে বলল, "থামো থামো, মধুশ্রী তো চণ্ডের সৎমা। শেষে অশ্লীলতার দায়ে আনন্দবাজার নিউজ করে দেবে।"

আমি বললাম, "অত রাগ কর কেন ভাই? আমি তো আর টাকা দিচ্ছি না যে আমার পরামর্শ মতো তোমাকে চলতে হবে। পছন্দ হয় করো, না হয় কোরো না, বাস। এর মধ্যে আবার রাগারাগি কেন? আমার কথামতো না করে অন্য কিছু একটা করো না। মনে কর, ওটাকে শহীদস্মরণ জনসভা করলেও তো হয়। কলেজবাড়িটাকে মহাকরণ করে দাও। পোস্টার প্ল্যাকার্ড হাতে যারা তাদের যুব কংগ্রেস করে দাও আর পুলিশ তো সব জমানাতেই পুলিশ। ছেলেমেয়েগুলোকে চেয়ার করে দাও আর লাঠিটাকে রুমাল; অথরিটি হলেন সুবোধ সরকার, মুছে দিচ্ছেন। আর হেডডাইনিকে একটু দাড়িগোঁফ দিয়ে ডহরবাবু করে এঁকে দাও আর এই নিওকমিউনিজমের দিকে কতগুলো ক্যাডার..." কথাটা ভালো করে বলতে না বলতেই তিনুচাঁদ আমার কান ধরে মারতে লাগল। আচ্ছা দেখ দেখি কি অন্যায়। আমি বন্ধুভাবে দুটো পরামর্শ দিতে গেলাম, তা তোমার পছন্দ হয়নি বলেই আমায় মারবে? যা বলেছি সব শুনলে তো? এর মধ্যে এত রাগ করবার কি হল বাপু?

*****


মহম্মদ জাফর ইকবালের একটি উপন্যাসে, পাকিস্তান আর্মির এক মেজর একজন রাজাকারকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, "এই দেশের মানুষ যদি কোনোদিন আমাদেরও ক্ষমা করে, তারা কোনোদিন তোমাদের ক্ষমা করবে না।" রাজাকারটি দৃশ্যত মাথা নেড়েছিল, প্রকৃতপ্রস্তাবে ল্যাজ।

প্রেসিডেন্সির ভিতরে থাকা দালালদের, প্রেসিডেন্সি, কোনোদিন, ক্ষমা করবে না।

এমিল জোলাকে কোট করে বলি, J'accuse.

No comments:

Post a Comment

গোরস্থানে সাবধান অথবা তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী

১. মধ্য য়ুরোপের একটি বিখ্যাত শহরের আউটস্কার্ট। হাইওয়ের থেকে কিছু দূরে, বিশাল বড় বড় গাছের ছায়া ঘেরা একটি সুন্দর সমাধিক্ষেত্র। বহুদূর থেকে এ...