Sunday, April 23, 2017

গোরস্থানে সাবধান অথবা তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী

১.
মধ্য য়ুরোপের একটি বিখ্যাত শহরের আউটস্কার্ট। হাইওয়ের থেকে কিছু দূরে, বিশাল বড় বড় গাছের ছায়া ঘেরা একটি সুন্দর সমাধিক্ষেত্র। বহুদূর থেকে এক ভদ্রলোক বেড়াতে এসেছেন ওই দেশে। দেশে থাকতে অনেক নাম শুনেছেন এই জায়গাটির, তাই গাইডকে নিয়ে তিনি দেখতে এসেছেন ওই সমাধিক্ষেত্র।

এই সমাধিক্ষেত্রটি কেন এত বিখ্যাত? কারণ, দিকপাল সব সঙ্গীতশিল্পীদের সমাহিত করা হয়েছে এখানে। জায়গাটি তাঁদের স্মৃতিধন্য। আরো একটি আশ্চর্য ব্যাপার, অলৌকিক বা কাকতালীয় যাই হোক, প্রতিটি সমাধির ওপরেই জন্ম নিয়েছে একটি করে ফুলের গাছ। সাদা ফুলের আদরে প্রায় ঢেকে থাকে সমাধিগুলি। প্রকৃতির নিজের হাতে ছড়িয়ে দেওয়া সেই পুষ্পাঞ্জলির পাশে ম্লান হয়ে যায় দূরদূরান্তর থেকে আসা ভক্তদের ফুলের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

গাইড ভদ্রলোকটিও এই শহরেরই মানুষ। গানবাজনা বিষয়ে তাঁরও জ্ঞান কিছু কম নয়। দুজনে সঙ্গীতশিল্পীদের কাজ নিয়ে কথা বলতে বলতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সমাধিক্ষেত্রটির একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। কদিন আ্গেই এক শিল্পী, বয়সে তিনি প্রায় তরুণই বলা চলে তখনো, দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। তাঁর সমাধির সামনে দুজনে বিষণ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হঠাৎ টুরিস্ট ভদ্রলোকের মনে পড়ল আর একজন প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর কথা। আজ থেকে বছর পঁচিশ আগে তাঁর একটি অ্যালবাম বেরিয়েছিল, একা হাতে তা পাল্টে দিয়েছিল গানের মানচিত্র। তরুণতর প্রজন্মগুলিকে ছুঁয়ে সেই গানগুলি চলে গিয়েছিল দিগ্বিজয়ে। কিছুদিনের জন্য জনপ্রিয়তায় সবাইকে পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন সেই গায়ক। অনেকই দিন হল, মারা গিয়েছেন তিনি। ট্যুরিস্ট অনুরোধ করলেন গাইডকে, একবার তাঁর সমাধিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আজকের দিনে তিনি তাঁর প্রিয় গায়কের সমাধিতে দাঁড়িয়ে স্মরণ করবেন সেই কৈশোরের দিনগুলি, যখন সেই অ্যালবাম তার সমস্ত ঐশ্বর্য নিয়ে চারিয়ে গিয়েছিল তাঁদের প্রজন্মের মধ্যে।

২.
এতক্ষণ গাইড হাসিমুখে ভদ্রলোককে নিয়ে গেছেন যেখানে তিনি যেতে চান। কিন্তু এইবার হঠাৎ দেখা গেল, তাঁর মুখটা ম্লান হয়ে গেছে। কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলেন গাইড, ভদ্রলোককে নিয়ে যেতে চাইলেন অন্য আরো কয়েকজন প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর কাছে। কিন্তু ট্যুরিস্ট নাছোড়বান্দা। শেষে হার মানতে হল গাইডকে। ট্যুরিস্টকে তিনি নিয়ে গেলেন বেশ কয়েকটি গাছ দিয়ে আড়াল করে রাখা সেই বিশেষ সমাধিটির দিকে।

দৃশ্যটি দেখে চোখে জল এল ট্যুরিস্টের। এ কী অমানবিক বর্বরতা। এই সমাধিটির পাশে কোনো ফুলের গাছ তো নেইই, এমনকি সমাধির ওপরে কোনো পাকা আচ্ছাদনও জোটেনি। অত্যন্ত অবহেলার সঙ্গে মাটি খুঁড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে কফিন। উপরের কাঁচা মাটি লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে, দেখে মনে হয় মৃতদেহ চোরেরা সমাধিটিকে খুঁড়তে চেষ্টা করেছে বেশ কয়েকবার। ট্যুরিস্ট ক্রুদ্ধ হয়ে ফিরলেন গাইডের দিকে, "এ কি? এই অবস্থা কেন ওঁর সমাধির?"

গাইড বুকে ক্রস আঁকতে আঁকতে জবাব দিলেন, "নিয়তি!"

"সে আবার কি? মৃত্যুর পরেও কারা করল ওঁর এমন অবমাননা? মানছি, উনি জীবনে কিছুটা দুর্মুখ ছিলেন। সকলকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পারেননি সব সময়, উদ্ধত ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সেসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই তো দোষে গুণে মানুষ। মৃত্যুর পরেও সেটুকু ভুলে থাকতে পারেননি আপনারা? এইভাবে দিনের পর দিন অসম্মান করে চলেছেন মানুষটাকে?"

গাইড ট্যুরিস্টের দুটি হাত ধরে বললেন, "আপনি এখান থেকে চলুন। আমি আপনাকে সমস্ত বুঝিয়ে বলছি। ওই দেখুন, বিকেল হয়ে আসছে, এখানে আর দাঁড়াবেন না অনুগ্রহ করে।"
গাইডের মুখের ওপর এমন একটা আন্তরিক আতঙ্কের ছাপ পড়ল যে ট্যুরিস্ট আর জেদ করতে পারলেন না। সমাধিস্থলের গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তিনি খানিকটা অবাক হয়েই বললেন, "কি ব্যাপার?"

৩.
গাইড বলতে শুরু করলেনঃ
"আপনি জানেন নিশ্চয়ই, আজ থেকে কয়েক বছর আগে যখন ওঁর মৃত্যু হয়, সেই ঘটনাটি সেভাবে কোনো মিডিয়াতে হেডলাইন হয়নি। ওঁর লক্ষ লক্ষ ভক্তের অনেকে জানতেই পারেনি, উনি মারা গেছেন। শহরের কর্তৃপক্ষই হয়তো একটি শোকসভা করে তা বিশ্বকে জানাতেন, কিন্তু সেখানেই হল সমস্যা।"

ট্যুরিস্টের মনে পড়ল, সত্যিই, এই গায়কের মৃত্যুসংবাদ সেভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। তিনি নিজে এঁর এত বড় ভক্ত শ্রোতা হয়েও বহুদিন বাদে লোকমুখে জেনেছেন যে, গায়ক মারা গেছেন। গাইড জানালেনঃ

কিছু বছর আগে যখন এক বিষণ্ন অপরাহ্নে গায়কের মৃত্যু হল, শহরের শোকাভিভূত নাগরিকেরা দল বেঁধে এল মৃতদেহ নিয়ে শেষকৃত্য করতে। প্রথা মেনে সমস্ত কাজ করে তারা সন্ধেবেলা ফিরে গেল আবার। পরের দিন সকালে আবার অনেকে এল, কারণ এই সমাধিক্ষেত্রে শিল্পীদের সমাহিত করার পরের দিন সকালে দেখা যায়, পরমকারুণিকের কৃপায় একটি ফুলগাছের চারা জন্ম নিয়েছে নতুন সমাধির পাশে। কিন্তু পরদিন যারা এলো, তারা দেখে অবাক হয়ে গেল যে, কোনো ফুলগাছ তো নেই-ই তার বদলে এলোমেলো লণ্ডভণ্ড হয়ে রয়েছে সমাধিটি, যেন কেউ মাটি খুঁড়ে প্রবল আক্রোশে তুলে আনতে চেয়েছে মৃতদেহ। আবার রীতি মেনে সমাহিত করা হল গায়ককে। পরের দিনও একই দৃশ্য। এই সমাধিক্ষেত্রটির সঙ্গে কিছু অলৌকিক কাহিনী জড়িত থাকায় কেউই এখানে প্রহরীর কাজ করতে রাজি হয় না। তার কোনো প্রয়োজনও পড়েনি এতদিন। কিন্তু পর পর দুদিন একই ঘটনা ঘটার পরে গায়কের এক দুঃসাহসী ভক্ত স্থির করল, সেইদিন রাতে সে পাহারা দেবে এখানে।

ট্যুরিস্ট মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন, বলে উঠলেন, "তারপর?"

গাইড গলার স্বর নামিয়ে আনলেন, "পরদিন সে যখন আসল কথাটি বলল, আমরা কেউ বিশ্বাস করতেই পারিনি। তারপর আরো অনেকে রাত্রে দেখেছে, নিজের চোখে দেখেছে সেই দৃশ্যটি। এমনকি আমি নিজেও দেখেছি। এখন আর অবিশ্বাস করার কোনো জায়গা নেই, কর্তৃপক্ষ তাই গাছ দিয়ে আড়াল করে দিয়েছেন ওই সমাধিটি।"

ট্যুরিস্ট বললেন, "কিন্তু ঘটনাটি কি?"

গাইড প্রায় ফিসফিস করে বললেন, "উনি মারা যাননি। আমাদের পার্শ্ববর্তী একটি দেশে ট্যুর করার সময়, কোনো এক অশুভক্ষণে উনি ভ্যাম্পায়ারের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন অতীতে। উনি ভ্যাম্পায়ার হয়ে গেছেন। আনডেড। প্রতিদিন সূর্যাস্তের পরে নিজের হাতে কবরের মাটি সরিয়ে উঠে আসেন। সেই অসামান্য প্রজ্ঞাবান মানুষটি আর নেই, এখন এক বিকৃত পিশাচে পরিণত হয়েছেন উনি। নিজে মুক্তি পাননি, তাই মৃত সঙ্গীতশিল্পীদের প্রতি অসম্ভব বিদ্বেষ তাঁর। সমস্ত রাত অকথ্য গালাগাল করেন তাঁদের, থুতু দেন তাঁদের সমাধিতে, তারপর ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে ফিরে যান মাটির নিচে অন্ধকারে।"

ট্যুরিস্ট বললেন, "আপনারা কোনো ব্যবস্থা নেননি?"

গাইড হতাশায় মাথা নেড়ে বললেন, "এক্সরসিজমের কথা উঠেছিল একবার। কিন্তু...", গাইড দিকচক্রবালের কিনারে নেমে আসা সূর্যের দিকে তাকিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন, "গোটা শহরে ওঁর এত ভক্ত, এত গুণগ্রাহী, এত ফ্যান ফলোয়িং। তারা রাজি হল না। তারা দাবি করল, উনি মৃত্যুহীন প্রাণ, মহামানব। উনি যা করে গেছেন, তা বুঝবার সাধ্য আমাদের নেই। তার জন্য আরেকবার ওঁকেই জন্মাতে হবে। তা যখন সম্ভব হচ্ছে না, তখন আমাদের কোনো অধিকার নেই এক্সরসিজম করার। কারণ তাদের যুক্তিতে, ওঁর মৃত্যু হয়নি, হতে পারে না। ওঁকে এভাবেই বেঁচে থাকতে দিতে হবে। নাহলে তারা শহর অচল করে দেবে। আমরা তাই আর কিছু করিনি, শুধু সমাধিক্ষেত্রটিকে হোলি ওয়াটার দিয়ে মন্ত্রঃপূত গণ্ডীতে ঘিরে দিয়েছি। বুঝতেই পারছেন, ওঁকে বেরোতে দিলে ব্যাপারটা সুখকর হবে না।"

৪.
ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক হয়তো এই আজগুবি গল্পের প্রতিবাদ করতেন, কিন্তু হঠাৎ তাঁর কানে এল পিছনদিকে কোথাও খস খস করে মাটি খোঁড়ার শব্দ। গোটা সমাধিক্ষেত্রে এতক্ষণে আর একটিও জনপ্রাণী নেই, ফলে ওই শব্দের উৎস নিয়েও আর কোনো সংশয় রইল না তাঁর। এতক্ষণে তাঁরা এসে পৌঁছেছেন দুর্ঘটনায় মৃত সেই তরুণ গায়কটির সমাধির পাশে। আক্ষেপে মাথা নেড়ে গাইড বললেন, "ভাবুন তো, কেউ কত অল্প বয়সে, অকালে চলে যায়। আর কেউ কেউ, মরার সময় পেরিয়ে গেলেও, প্রভূ যীশু আমায় ক্ষমা করুন, মরতে চায় না।" অপরিসীম ক্লান্তিতে, হতাশায়, খানিকটা ভয়েও ট্যুরিস্ট বিহ্বল। তিনি কথা বলতে পারলেন না, শুধু মাথা নাড়লেন ধীরে ধীরে।

যখন সন্ধে নামছে, দুজনে ঠিক তার আগে সমাধিক্ষেত্রের কারুকার্যখচিত গেট পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। গোটা এলাকাটার ওপর কেমন যেন একটা অশুভ, থমথমে ভাব চেপে বসেছিল এতক্ষণ। অথচ, হোলি ওয়াটারের গণ্ডিটি পেরোতেই সেই ব্যাপারটি এক লহমায় কেটে গেল। গাইড হাঁফ ছেড়ে কিছু একটা বলতে যাবেন, হঠাৎ সমাধিক্ষেত্রের ভিতর থেকে ভেসে এল পা টেনে টেনে হাঁটার শব্দ। গাইডের হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন ট্যুরিস্ট। গাইড বললেন, ভয় পাবেন না। গণ্ডীর বাইরে আসার ক্ষমতা নেই পিশাচের।

গাছের গণ্ডী দিয়ে সযত্নে আড়াল করে রাখা জায়গাটি থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে এল একটি দীর্ঘকায়, মুণ্ডিতমস্তক মূর্তি। তার হাঁটাচলার মধ্যেই এমন একটি অপ্রাকৃত ব্যাপার ছিল, ট্যুরিস্ট বুঝলেন, ও মূর্তি কোনো জীবন্ত মানুষের নয়। অতৃপ্ত কামনার লালা ঝরে পড়ছিল তার মুখ থেকে, পচা মাংসের গন্ধ ভেসে আসছিল। পিশাচ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল একবার। তারপর অব্যর্থভাবে সমাধিক্ষেত্রের গেটের এপারে দাঁড়িয়ে থাকা হতভম্ব মানুষদুটির দিকে তাকিয়ে, চিরপরিচিত ভরাট গলায় গর্জে উঠলঃ

"শালা মাকুনকুশিরদাঁড়াগাঁড়াধাঁড়া কৃমির বাচ্চা..."

কানে আঙুল দিয়ে দুজনে প্রায় দৌড়তে লাগলেন শহরের দিকে।

***
[এই লেখার সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। জীবিত বা মৃত, মৃত্যুঞ্জয়ী বা আনডেড কারো সঙ্গে কোনোরকম মিল পাওয়া গেলে তা একান্তই কাকতালীয়।]

No comments:

Post a Comment

গোরস্থানে সাবধান অথবা তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী

১. মধ্য য়ুরোপের একটি বিখ্যাত শহরের আউটস্কার্ট। হাইওয়ের থেকে কিছু দূরে, বিশাল বড় বড় গাছের ছায়া ঘেরা একটি সুন্দর সমাধিক্ষেত্র। বহুদূর থেকে এ...